বিথীর স্বপ্ন নারী ক্রিকেট নিয়ে বহুদূর যাওয়া

নারী ক্রিকেটার আরিফা জাহান বিথী। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলেছেন। ২০১৭ সালে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে ইতি টানেন পেশাদার ক্রিকেট থেকে। ক্রিকেটার পরিচয় ছাপিয়ে বিথী এখন হয়ে উঠেছেন দেশের লাখো কিশোরীর আদর্শ৷ নিজের গড়া ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি’-তে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন কিশোরীদেরকে। বিথী স্বপ্ন দেখেন এই কিশোরীরা একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে বিশ্ব জয় করবে। ক’দিন আগে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে তার উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি। শুধু নারী ক্রিকেটার তৈরীই নয়, বিথী কাজ করছেন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও। টাইগার্স কেইভকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানালেন একাডেমি নিয়ে তার সংগ্রামের কথা, আগামী দিনের স্বপ্নের কথা। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা স্বপ্নবাজ বিথীর গল্প শুনেছেন মাজিদ ফাহিম

প্রশ্ন : অনেক প্রতিবন্ধকতা সামলেই নিশ্চয় ক্রিকেটে এসেছেন?

উত্তর : আসলে একজন নারী হয়ে অন্য যে কোনো পেশায় অনেক সহজেই যাওয়া যায়। সেখানে খুব একটা বাধা আসে না। কিন্তু, খেলাধুলার সেক্টরটা নারীর জন্য অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া, একজন নারী হয়েও যে ক্রিকেট নিয়ে কাজ করা যায় এটি অনেকে চিন্তা করতে পারে না। এখানে সামাজিক বলেন, পারিবারিক বলেন কিংবা আত্মীয়-স্বজন, সবদিক থেকে একটা বাধা সৃষ্টি হয়। অনেক কটু মন্তব্যও শুনতে হয়। সেসব টপকে আসাটা আসলেই অনেক চ্যালেঞ্জিং।

প্রশ্ন : যেমনটা বললেন, নারীদের নিয়ে কাজ করতে অনেক প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হয়। কাজ করতে সাহসও প্রয়োজন। এই অদম্য ভাবনাটা কোথা থেকে এলো?

উত্তর : আমি যখন ক্রিকেট খেলতাম, অনুশীলনের যেমন সুযোগ খুঁজেছিলাম তেমনটা পাইনি। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল আমার অর্থনৈতিক দিক। সবসময় টাকা দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে বা যাতায়াত করতে পারতাম না। আমার কাছে মনে হয়েছে যেহেতু আমি অনেক কষ্ট করেছি ক্রিকেট নিয়ে, সেহেতু ক্রিকেটের জন্যই কিছু একটা করব। সেজন্য আসলে এই ক্রিকেট একাডেমি খোলা। এখন পর্যন্ত চ্যালেঞ্জেই আছি। একটা মেয়েকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আমরা আসলে সবাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কথা বলি। কথা বলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কতটা করা যায় আমি জানি না। তবে কোনো না কোনো কর্মক্ষেত্রে নারীকে যদি আটকে দেওয়া যায়, তখন মনে হয় সেই নারী অন্যদিকে মুভ করতে পারে। সেই পরিবার বিয়ের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসে। এসব ভাবনা আমার থেকে মনে হয়েছে একডেমি খোলা উচিত। এজন্যই, মূলত বিনামূল্যে ক্রিকেট একাডেমি চালু করি।

প্রশ্ন : এতো প্রতিবন্ধকতা নিয়ে একজন কিশোরী কেন ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখবে?

উত্তর : দেখুন, ক্রিকেটই একমাত্র খেলা যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলে। অর্থনৈতিক দিকটাও এখানে অনেক বেশি শক্তিশালী। পেশার দিক থেকে যদি চিন্তা করি তাহলে সে দিকটা তো আসলে অনেক সহজ। যদি নারীরা প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এই পেশায় আসতে পারে তাহলে ভালো। আমরা আসলে এভাবেই প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি যাতে ক্রিকেট নামেও যে একটা পেশা আছে এটা যেন সবাই চিন্তা করে। এজন্য আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে। পরিবারগুলোর প্রতিও আমাদের আহবান থাকে, কেউ চাইলে ক্রিকেটকেও পেশা হিসেবে নিতে পারে। এখানেও ক্যারিয়ার গড়তে পারে৷

প্রশ্ন : বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখন চমৎকার খেলছে। আপনারা যখন খেলতেন তখনকার ও এখনকার পার্থক্যটা কোথায়?

উত্তর : আগে যখন আমরা খেলতাম তখন এত পরিমাণ অর্থ ছিল না। আসলে শুরু থেকে কখনও কোনো কিছু ভালোভাবে হয় না। এখন একটার পর একটা অর্জন নারীরা নিয়ে আসছে। অর্থের পরিমাণও বাড়ছে। আগের থেকে এখন তুলনামূলক অনেক ভালো। একটা নারী এই মূহুর্তে খুব সুন্দর করে ক্রিকেটকে বেছে নিতে পারে, তার জন্য সহজ হয়ে যাবে এখানে ক্যারিয়ার গড়া।

প্রশ্ন : পুরুষ জাতীয় দল নিয়ে এবার একটু কথা বলা যাক। হতাশা নিয়েই আসলে তারা বিশ্বকাপ থেকে ফিরেছে। আপনার কি মনে হয় না দলকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন? কোন কোন জায়গায় আসলে উন্নতি দরকার?

উত্তর : আমরা তো বোর্ডের একদম ভেতরের ব্যাপার জানি না। তবে, আমার মনে হয় যেহেতু এখনও সিনিয়র প্লেয়াররা আছেন তাই সিনিয়র প্লেয়ারদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রেজাল্টের ব্যাপারে বলব, ভালো-খারাপ তো থাকেই। আমার আসলে এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো। এতটুকু বলব, সিনিয়র প্লেয়াররা দেশকে আগেও রিপ্রেজেন্ট করেছে এবং তাদের অনেক বড় অর্জনও আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। তাদের একটু বেশি গুরুত্ব দিলে, যারা ছোট থেকে ঐ জায়গায় যাওয়ার চিন্তা করছে তারা সহজেই ইতিবাচক চিন্তা করতে পারবে। যখন ছোটরা দেখবে সিনিয়রদের গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না, যতটুকু সম্মান পাওয়া দরকার ততটুকু পাচ্ছে না, তখন তারা একটু হলেও পিছিয়ে পড়বে।

প্রশ্ন : একাডেমির বিষয়ে ফিরে আসি। আপনার একাডেমিতে মূলত কারা আসে? একাডেমি চালাতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে থেমে যাওয়ার চিন্তা কখনও এসেছিল?

উত্তর : যখন একাডেমি চালু করি, সত্যি বলতে আমি আসলে অনেক সহজ ভেবেছিলাম। এটি বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেট একাডেমি। শুরুর পর অনেক প্রতিবন্ধকতাই তৈরী হয়েছে। একটা মেয়ে চাইলেই ড্রেস চেঞ্জ করে মাঠে আসতে পারে না। তাদের ওয়াশরুম যে বিষয়, এটি নিয়ে আমরা অনেক কষ্ট করছি। একটা মেয়ের ড্রেস চেঞ্জ করা বা ওয়াশরুমে যাওয়ার বিষয়ের কোনো ব্যবস্থা একদমই করতে পারছি না। মাঠের ব্যাপারেও সবসময় প্রতিবন্ধকতা আছে। এতকিছুর পরও এই অল্প সময়ে আমাদের অনেক অর্জন আছে। আমাদের একাডেমির মেয়ের প্রিমিয়ার লিগ খেলছে, এনসিএলে খেলছে। এতো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে এই মেয়েরা বাংলাদেশে নেতৃত্ব দিত।

প্রশ্ন : আগামীতে উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমিকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

উত্তর : আমার ভাবনা হলো, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই একাডেমির মেয়েরা বাংলাদেশ জাতীয় দলে নেতৃত্ব দিবে, বাংলাদেশের হয়ে খেলবে। আর আমাদের একাডেমি শুধু ক্রিকেট নিয়েই আছে, তা নয়। নারীর ক্ষমতায়ন বা নারীদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও অনেক সেক্টরেই কাজ করছি। অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম, স্বাবলম্বী প্রোগ্রাম এগুলো নিয়ে কাজ করছি৷ এসব নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমার একাডেমির ৯০ শতাংশ মেয়েরা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা। কারও বাবা কৃষক, কারও বাবা ঝালমুড়িওয়ালা। এ ধরণের মেয়েরাই বেশি। এদের নিয়ে আমার স্বপ্নটা অনেক বড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here