গল্পঃ লাল সবুজেই প্রত্যাবর্তন

জাহিরুল কাইয়ুম ফিরোজঃ  ‘প্রথম’ সবকিছুর অনুভূতির কাছে বাকী সব তুচ্ছ। ক্লাসে প্রথমবার প্রথম হওয়া, প্রথমবার বৃত্তি পাওয়া, প্রথমদিন কলেজে যাওয়া, প্রথম প্রেম, প্রথম ব্রেকআপ সবকিছুই অন্যরকম! প্রথম যেদিন পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বাসায় আসি সেদিন ঘরে প্রথমবারের মতো মিষ্টির মিষ্টতায় সকলে একসঙ্গে ডুব দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়; প্রাথমিকে বৃত্তি পাওয়ার খবর শুনে বাবা অফিস শেষ না করেই ছুটে এসেছেন বাসায়, আমায় কংগ্রেচ্যুলেট করবেন বলে! বাবার তরফ থেকে নির্দিষ্ট উপহারের বালাই ছিলো না। বাজারে গেলাম, খেলনার দোকানে ঢুকলাম। নজরে পড়লো শচীন টেন্ডুলকারের ছবি সংবলিত একটি ব্যাট। বায়না ধরলাম, বাবা কিনে দিলো। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে…

ক্লাস সিক্সের প্রথম কার্যক্রম। হাজিরা হয়েই ছুটি হতো। স্কুলের বিশাল মাঠে চলতো জমিয়ে খেলাধুলা। ব্যাডমিন্টন, ভলিবলের কোর্ট থাকলেও ক্রিকেট টানতো বেশি। খেলতাম, ছক্কা হাঁকাতাম, নিজেকে শচীন ভেবে ঘরে ফিরতাম। তখন সে সব ছিলো রোজকার রুটিন। ভালোলাগায় হারাতাম। ২০০৭ এর ভারতবধ কাব্যের পুরোটার সাক্ষী না হলেও বিজয়ের পর উন্মাতাল পাড়ার মিছিলে ঠিকই শামিল হয়েছিলাম। কিংবা সে বছরের ক্যারিবিয়ান ক্যালমায়ও রাতবিরাতে ঘর ছেড়েছিলাম। তখন আবার ঘরে ফিরতাম, কিন্তু শেষবার যখন ঘর ছেড়েছি আর ফেরা হয়নি!

ডায়েরীটা একপাশে রেখে কাঁদছে মুকুল। মুকুলের হঠাৎ গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় রুমমেট আসিফের। বিরক্ত হবার কথা। না, আসিফ বিরক্ত হয়নি। সে সমব্যথী! সেও ঘরছাড়া! চাইলেও সহসা বাড়ি ফিরতে পারবে না, পারবে না মায়ের বানানো মুড়ি-চানাচুর সামনে নিয়ে বাবার সঙ্গে একসাথে বাংলাদেশ বলে গর্জে উঠতে! ওরা সমাজের চোখে অপরাধী! ওরা অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত…

কাল বাংলাদেশের খেলা। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল। কত আরাধ্য ট্রফি, কত স্বপ্নেবিহ্বল দিবস-রজনী জড়িত, কতো নেশাতুর আকাঙ্খায় দিনগোনা। অবশেষে ফাইনাল এলো। চারিদিকে সাজ সাজ রব, হৈ-হুল্লোড় আর পটকাবাজির দোকানে দুরন্ত কৈশোরের ভীড়! আসিফ-মুকুলদের অফিসেও আজ সাজ সাজ রব। তাদের উপলক্ষ্য ভিন্ন হলেও ফাইনাল কেন্দ্রিক! সবকিছু যখন ফাইনালে ডুবে থাকবে তখন ওরা আজ সবচেয়ে বড় অস্ত্রের ডিলটা করবে। সেইভাবেই প্রস্তুত হচ্ছে সকলে। কখন ঘনাবে সন্ধ্যা…

সন্ধ্যা এলো। বাজলো রেড অ্যালার্ট! বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে এবং মুকুলদের অফিসে! বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে ধুকছে। জয় থেকে এখনো সত্তর রান দূরে। শেষ দশ ওভারের খেলা চলছে। হাতে পাঁচটি উইকেট। ওদিকে মুকুলদের অফিসে পুলিশের ঘেরাও! জেলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে আসিফ-মুকুল দুজনই। আজ আর রক্ষা নেই! আঁধার থেকে আরো আঁধারে নিক্ষিপ্ত হবার প্রহর গুনছে ওরা!

হঠাৎ ফাঁকা গুলির আওয়াজ। গুলি নয়, গলির মাথায় বাজি ফুটার শব্দ। ছয় মেরেছে বাংলাদেশ, পর পর দু’বলে। বাংলাদেশের ছয়ের সাথে জেগেছে বিজয়ের আশা, ওদের দুজনেরও বাঁচার সাধ আঁকিবুকি আঁকছে হৃদয়ে। কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ, মাটিতে ভারী কিছুর পতনের শব্দ, দ্রুতলয়ে দু’জোড়া পায়ের দৌঁড়ানোর শব্দ। ওরা পালাচ্ছে। পুলিশের চেখকে ফাঁকি দিয়ে ওরা পালাচ্ছে! কতক্ষণ দৌঁড়ালো তার হিসেব দুজনের কেউই কষেনি। তারা থমকে দাঁড়িয়েছে আলো ঝলমলে মহাসড়কের মাথায়, জনসমুদ্রের কিনারে! বড়পর্দা, চিৎকার, কিছু চিন্তিত চাহনি, কয়েকফোঁটা ঘাম আর কিছু বাজির সুতোয় আগুন লাগার অপেক্ষা। এক ওভার, পনের রান, হাতে তিন উইকেট। পারবে বাংলাদেশ?

পারলো বাংলাদেশ। বড়রাস্তার ধারের বড়পর্দায় বিজয়োল্লাসে ওরাও শামিল হলো। বুকে বুক মেলালো, হাতে হাত। এর মাঝে একটি বুকের উত্থানপতনের সাথে বেশ পরিচিত মুকুল। ‘বাবা  আসিফ, আমার বাবা’! মুকুলের চোখে অশ্রু। বাবার চোখেও অশ্রু। খোকা ফিরলো তার বুকে। চল বাবা ঘরে ফিরি। দাঁড়াও, মিষ্টি কিনে নি। খালি হাতে কি বিজয়োৎসব করা যায়? ‘এ বিজয় উৎসব নয় মুকুল, এ তোর ঘরে ফেরার উৎসব’-বললো আসিফ। আরেকপ্রস্থ ক্রন্দন। বহুদিনের জমানো ক্রন্দন। চল আসিফ, তুইও চল। চল…

প্রত্যাবর্তনের গল্পে মূল নায়ক কে? মুকুল নাকি আসিফ? এদের কেউ নয়! নায়ক লালসবুজ, নায়ক বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ না দেখা একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্ম মৃত্যুর আগে বলে যেতে পারবে- আমরা দেখেছি। আমরা যোদ্ধা দেখেছি যারা আমাদের একসুতোয় বাঁধে। যারা আমাদের বাঁচতে শেখায় প্রতিটি শটে, প্রতিটি ডেলিভারিতে, প্রতিটি স্পেলে। আমরা সাদাকালো টিভিতে ‘ওরা এগারো জন’ দেখেছিলাম বহুবছর আগে। এখন আবার দেখছি। দলবেঁধে, সকলে মিলে একীভূত হয়ে! রঙীন ফ্রেমে ওই এগারো’র প্রত্যাবর্তন দেখছি প্রতিনিয়ত…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here