বিসিবি’র হিসেবের বাইরে থাকা কিংবদন্তি রফিকের গল্প

একজন বাংলাদেশী একদিন টেস্টে ১০০ উইকেট নিবে, এই স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন তিনি। একজন বাংলাদেশী টেস্ট এবং ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই ১০০ উইকেট ও ১০০০ রান করবে, এই স্বপ্নও সত্যি করেছিলেন তিনি। তিনি মোহাম্মদ রফিক। তাঁর অজানা গল্প নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। লিখেছেন রুহেল বিন ছায়েদ। 

বুড়িগঙ্গার তীরঘেষে গড়ে উঠা ঝিনঝিরা বস্তিতে সারাদিন ক্রিকেট খেলে আর মাছ ধরে সময় কাটানো ছোটবেলার রফিক দেখেছিলেন দারিদ্র্যতাকে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত মোহাম্মদ রফিক একদিন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা স্পিনার হবেন এই কথা কেই বা ভেবেছিলো? রফিক নিজেও কি ভেবেছিলেন?

২০০১ এ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর খেলেছেন ২০১০ সাল পর্যন্ত। তবে আইসিএল খেলতে গিয়ে নিষিদ্ধও হয়েছিলেন। খারাপ সময় পেছনে ফেলে আবার ফিরেও এসেছিলেন রফিক। ক্রিকেট পরবর্তী জীবনটা ছিলো রফিকের জন্য ভীষণ একঘেয়ে এবং কষ্টের। যে ছেলেটা ফেরীতে করে শত কষ্ট করে শহরে যেত ক্রিকেট খেলতে, যে ছেলেটা দলে একটা মাত্র সুযোগের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলো প্রায় সেই ছেলেটা কি ক্রিকেট ছাড়া থাকতে পারে?

না, মোহাম্মদ রফিক স্বপ্নেও চিন্তা করেননি ক্রিকেট থেকে তার আত্মিক সম্পর্ক নষ্ট হোক।  অনেক কিছুরই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন কিউরেটর হবেন। কিন্তু না, পরে ভাবলেন কোচিংয়েই মনযোগ দিবেন। ভারত থেকে এসেছিলো সৌরভ গাঙ্গুলীর প্রস্তাবও। কিন্তু রফিক সিদ্ধান্ত নিলেন দেশেই থাকবেন। দেশের জন্য নিজের অর্জিত মেধা ব্যাবহার করবেন। কিন্তু দেশ তাকে মূল্যায়ন করলো কোথায়? ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার পরই দেশের ইতিহাসের সেরা এই স্পিন প্রতিভা হারিয়ে গেলেন। দেশের ক্রিকেট বোর্ড আর গণমাধ্যমের পাদপ্রদীপের আলো কোনওভাবেই খোঁজ নেয়নি রফিকের।

দেশের ক্রিকেটের জীবন্ত এই ‘কিংবদন্তী’ সব সময় মন থেকে চেয়েছেন ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়নের সাথে নিজেকে জড়াতে। তবে কে শুনে তার আকুতি? দেশের ক্রিকেট বোর্ডই যে তাকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনবোধ করেনি সেভাবে। হ্যাঁ, মাঝে একবার রফিককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো বিসিবির হাইপারফরম্যান্স দলের স্পিন উপদেষ্টা হিসেবে। কিন্তু তা অল্প কিছু দিনের জন্য এবং ক্ষেত্র বিশেষে অগুরুত্বপুর্নও বটে!

কারণ এইচপি দলের স্পিন উপদেষ্টা হিসেবে রফিক একা ছিলেন না, ছিলেন ওয়াহিদুল গণির সাথে যৌথভাবে। বুঝাই যাচ্ছে কতটা গৌণ ছিলো রফিকের কাজ।

বলা হচ্ছে দেশের ক্রিকেটের পেস বোলিং উত্থানের এই যুগে সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে স্পিন ডিপার্টমেন্ট। কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ ছিল স্পিন নির্ভর। সেখানে বাঁহাতি স্পিনাররাই ছিলেন মূল অস্ত্র। কয়েকজন অফ স্পিনার, লেগ স্পিনারও দেখা গেছে কদাচিত্।

কিন্তু পেস বোলারদের আধিক্যের এই বর্তমান সময়ে একেবারেই অনুজ্জ্বল হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। টেস্ট স্ট্যাটাস উত্তর যুগে মোহাম্মদ রফিক, এনামুল হক জুনিয়র, আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসানরাই স্পিন আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মাঝে অফ স্পিনার সোহাগ গাজী, বাঁহাতি স্পিনার ইলিয়াস সানি, আরাফাত সানি, লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন এসে হারিয়ে গেছেন। সাকিবের সঙ্গে এখন তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজরা মূল ভূমিকায় থাকছেন।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, নাসির হোসেনের মতো অফ স্পিনাররা অনেক সময় সফলতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু আগের সেই জৌলুস হারিয়ে খুঁজছে বর্তমান বাংলাদেশ দল। এই খারাপ সময়ে কি আমরা দেশের স্পিন ‘কিংবদন্তী’ রফিককে কাজে লাগাতে পারিনা? আমরা কি পারিনা রফিককে তাইজুল, মিরাজ, সানজামুলদের গুরু হিসেবে জাতীয় দলের দায়িত্ব দিতে?

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক স্পিন বোলিং কোচ ছিলেন শ্রীলঙ্কান রুয়ান কালপাগে। তার অনেকটা আকস্মিক বিদায়ে দল হয়ে পড়ছিল স্পিন বোলিংয়ে অভিবাবকহীন। রুয়ান কালপাগের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি বাতিলের পর থেকে কোচ ছাড়াই চলছিল বাংলাদেশের স্পিন ডিপার্টমেন্ট। অপেক্ষা ফুরোয় না। কয়েকবার জোরেশোরে কিছু নাম সামনে আসলেও বিসিবি কারো সঙ্গেই চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি। সে তালিকায় নাম এসেছে অনেকের। কিন্তু নাম আসেনি রফিকের! কোচ হিসেবে যে বিসিবির কোন কালেই পছন্দ নয় রফিককে। তাদের পছন্দ ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া কিংবা শ্রীলঙ্কার কিছু ‘বড় নাম’ ! তাদের হিসেবে বিসিবির কাছে তো রফিক কিছুই না! শেষ পর্যন্ত ভারতীয় শোনীল যোশির হাতে দেয়া হলো বাংলাদেশের স্পিন ডিপার্টমেন্টের হাল।

টেস্ট এবং ওয়ানডে এই দুই ফরম্যাটেই বল হাতে একশ উইকেট পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম বোলার মোহাম্মদ রফিক। বাংলাদেশ দলে যতদিন ছিলেন সমান তালে খেলে গেছেন টেস্ট ও ওয়ানডে ম্যাচ। প্রধান বোলিং অস্ত্র হিসেবে বাংলাদেশ দলকে তিনি সার্ভিস দিয়েছেন টানা ১৪ বছর। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর এখনও মোহাম্মদ রফিক দেশের ক্রিকেটকে দিতেই চান।


মোহাম্মদ রফিক কয়েকদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রিটায়ার্ড করলেও আমি দেশের জন্য কাজ করতেই বসে আছি। দেশের হয়ে এতো বছর ক্রিকেট খেলেছি এখন শেষ সময়টা ক্রিকেট নিয়েই থাকতে চাই। বোর্ড যদি মনে করে রফিককে স্পিনে দরকার, আমি সবসময় বোর্ডের ডাকের অপেক্ষাতেই আছি।’

রফিক বোর্ডের ডাকের অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সে ডাক তবু পান না! কারণ আমরা রফিকদের মূল্যায়ন করতে জানিনা। দেশের জন্য যার এত অবদান তাকে রেখে দিই অগোচরে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল রফিককে সবচেয়ে বড় আশ্রয়টা দিয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু রফিক নিজেই রফিক হয়েছেন। নিজের কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের গুণে নিজেকে করে তুলেছেন সেরা। রফিকের সবচেয়ে বড় কীর্তি এসবের কোনোটাই নয়। দেশের শ্রেষ্ঠ স্পিনার হওয়া, ব্যাক্তিজীবনের সংগ্রাম কিংবা মুলতানে সেই রান আউট না করে স্পিরিট অব ক্রিকেটের প্রতীক হয়ে যাওয়া; রফিককে অনেক কারণেই মনে রাখা যায়।

কিন্তু এর কোনোটাই রফিক নন। রফিক হলেন সেই মানুষ; যিনি বুড়িগঙ্গার চর থেকে উঠে এসে আমাদের এই আলো ঝলমলে দুনিয়ার তারকা হয়েছেন এবং আবার বুড়িগঙ্গার তীরে ফিরে গেছেন। রফিক মনেপ্রানে, সংষ্কৃতিতে একটা মুহুর্তের জন্যও কেতাবী শহুরে হননি। অযথা নিজেকে কেতাদূরস্ত করার চেষ্টা করনেনি। মনেপ্রাণে তিনি ওই পুরোনো ঢাকায় বা নদীর তীরে রেখে আসা ভাই-বন্ধুদের একজন হয়ে রয়েছেন। হতে পারেননি শুধু নতুন প্রজন্মের ‘রফিকদের’ একজন যোগ্য কারিগর। রফিকের উত্থানের প্রতিটি ধাপে যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থান ঘটেছিলো তা ভুলে গেছে দেশের ক্রিকেট বোর্ড।

বিসিবির সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার। সুনীল যোশি বা ভেঙ্কটেশ রাজু নয় রফিকই পারেন তাইজুল, মিরাজ, সানজামুলদের পথ দেখাতে। নিখুঁত লাইন ও লেন্থে বল ফেলা এবং ফিল্ডিং অনুযায়ী বোলিং করা শেখাতে পারেন একজন রফিকই। রফিকই পারবেন, এখনকার তরুণ-যুবাদের হাত ধরে টাইট বোলিং শেখাতে। উইকেটের সুবিধা না পেলেও কিভাবে বাড়তি টার্ন করানো যায়, ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা বুঝে কখন আর্মার ছুড়তে হবে। তবু সুবোধের উদয় হয় না দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের অমূল্য রত্নকে তারা হারিয়ে যেতে দিয়েছেন, হারিয়ে যেতে দিতে দিচ্ছেন পরম অবহেলায়। কিংবদন্তী রফিককে তাই বাতিলের খাতায় রেখে দিয়েছে আমাদের উচ্চাবিলাসী ক্রিকেট বোর্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here