গল্পঃ “ক্রিকেন্টাইন্স ডে”

জহিরুল কাইয়ুম ফিরোজঃ প্রত্যয় মেয়ে পাগলা। বন্ধু বিজয়ের সাথে মিলে সারাদিন টো টো করে মেয়েদের বিরক্ত করাই ওর কাজ। প্রত্যয়ের কয়েকটা নির্দিষ্ট আড্ডাস্থান আছে। সকালবেলা নকিব স্যারের বাসার সামনে। স্যারের কাছে পড়তে আসা মেয়েগুলা একেকটা যেন ওর কাছে অপ্সরী! দুপুরে প্রত্যয়ের ফোনে কল দিলে বিজি পাবেন কারণ ফোন এয়ারপ্লেন মোডে থাকে! যাতে গার্লস কলেজের মেয়েদের ক্যাপচারে কোনরূপ বিঘ্ন না ঘটে। এরপরের সময়টুকু বাসায় গিয়ে দৈনন্দিন কাজ সাড়ার জন্য বরাদ্দ! সন্ধ্যায় মানিক চাচার চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় প্রত্যয় বিজয়রা। মানিক চাচার দোকান একেবারে কোচিং সেন্টারের বিপরীতে। দুইবন্ধুর একটাই কাজ, মেয়ে নিয়ে গবেষণা!

সপ্তাহের সাতদিনই ওরা ভীষণ ব্যস্ত। কোনদিকে ওদের মন নেই। বন্ধু আছে ওদের, সেটা নামে মাত্র। তাদের একজন শাকিল। পাড়ার নামকরা ক্রিকেটার। শর্টপিচ হোক বা বিগ তার জুড়ি নেই। প্রত্যয় বিজয় মুদ্রার এপিঠ হলে শাকিল ওপিঠ! ওরা মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, শাকিলের যত ব্যস্ততা ব্যাটবলকে ঘিরে। আজ এখানে টুর্নামেন্ট তো কাল ওখানে। ওর কাছে জীবন মানে ক্রিকেট। একদিন একপ্রকার জোরাজুরি করেই ওদের দুজনকে নিয়ে গেল মাঠে!

শর্টপিচ টিভি কাপ টুর্নামেন্টের ফাইনাল। রাতের বেলা খেলা। খেলাধুলা না করলেও প্রত্যয় ক্রিকেট খারাপ খেলে না। ব্যাটিং বোলিংয়ে দারুণ কন্ট্রিবিউট করেছে, দলও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যদিও খেলার পুরোটা সময়ই নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে প্রত্যয়! আজ যে তানিয়াকে দেখা হলো না! কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে প্রতিদিন মানিক চাচার দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর কোথায় যেন উধাও! প্রত্যয় এ রহস্যের কিনারা পায় না। চোখাচোখি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ দুজনের চাওয়া পাওয়া। কিন্তু কে জানতো আজকের ক্রিকেট ম্যাচ বদলে দেবে প্রত্যয়ের দুনিয়া! যে মাঠে টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়েছে তা তানিয়ার বাসার সামনেই। হয়তো প্রত্যয়ের মতো কেউ ভেবে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছিল তানিয়া (সে জানতো প্রত্যয় খেলেটেলে না, তাই সিওর হতে এসেছিল প্রত্যয় কিনা)। পুরো খেলাই দেখেছে। খেলা শেষে বাড়ি যাবে এমন সময় প্রত্যয়েরও নজরে পড়লো তানিয়া, প্রিয় চোখজোড়া!

এখন বিকালে প্রত্যয়ের একটাই কাজ। ক্রিকেট খেলা। যাকে ধরে বেঁধেও মাঠে আনা যেত না সে এখন মাঠ কামড়ে থাকে সারা বিকেল! অবশ্য খেলা নয়, মূখ্য ব্যাপার তানিয়ার জন্য অপেক্ষা করা। সন্ধ্যার সময় কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হলে দুজন একত্রেই পথচলে। এরপর প্রত্যয় বিজয়ের সাথে মানিক চাচার দোকানে বসে আড্ডা মারে আর তানিয়া কোচিং ক্লাসে মনোযোগ দেয়। এভাবেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুচ্ছিলো ওদের কাহিনি। ওদিকে ক্রিকেট খেলতে খেলতে প্রত্যয়েরও নেশা ধরে গেছে ব্যাটবল অার বাইশ গজের প্রতি। মেসেঞ্জারের টুংটাংয়ের চেয়ে বেশি ভালো লাগে কাঠের শব্দ। তানিয়ার সাথে ফোনালাপের চেয়ে ঢের উপভোগ্য টিভিতে টেস্ট ম্যাচ দেখা! এখন প্রত্যয় নকিব স্যারের বাসার সামনে যায় না, দুপুরে ওর ফোন বিজি থাকে না, সন্ধ্যায় মানিক চাচার দোকানেও আড্ডা দেয় না। সারাক্ষণ ব্যাটবলে মেতে থাকে!

আজ পহেলা জানুয়ারী। তানিয়ার জন্মদিন। আবার আজ ইংরেজি নববর্ষও। অন্য সময় হলে দিনটি ঈদের চেয়ে বেশি আনন্দ নিয়ে আসতো প্রত্যয়ের জীবনে। অথচ আজ দোটানায় সে। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে নিজে, বদলে গেছে ভালো লাগা! আজ এলাকায় গোল্ডকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ তাও রাতের বেলা! কি করবে প্রত্যয়? তানিয়া না ক্রিকেট? অনায়াসেই তানিয়াকে বেছে নেওয়া যেত কেননা ক্রিকেট আবারো খেলতে পারবে যেখানে তানিয়ার জন্মদিন আর ভালোবাসা দিবস বছরে একবারই! কিন্তু, আজকের ম্যাচে চোখ থাকবে একজন কোচের যিনি একটি খ্যাতনামা একাডেমির দায়িত্বে রয়েছেন। এমন সুযোগ রোজ রোজ আসবে না!

সারাদিন চিন্তায় কেটে গেল। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তানিয়া না ক্রিকেট? সম্পর্ক নাকি ক্যারিয়ারের হাতছানি? এমন সময় প্রিয় মানুষটির ফোন…

– হ্যালো, কোথায় তুমি?
– বাসায়।
– কি করছো? আমাকে আজকে তোমার ঘুরাতে নিয়ে যাবার কথা ভুলে গেছো?
– ভুলিনি। তবে…
– তবে কি? কথা বলছো না যে? হ্যালো, হ্যালো…!
– তানিয়া, আমি আসতে পারবো না। প্লিজ রাগ করে না।
– দরজাটা খোলো…

বিমর্ষ হয়ে দরজা খুলতেই অবাক প্রত্যয়! তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে। পাশে বিজয়। তানিয়ার হাতে একটি ক্রিকেট ব্যাট!
‘আমার জন্মদিনে কিছু গিফট করবে না’?

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্যয়। ‘ধরো, মাঠে যাও। একদিন যেন তোমায় টিভিতে দেখি। খবরদার, ম্যাচসেরা না হয়ে ঘরে ফিরবা না’- বলেই ব্যাটটা হাতে ধরিয়ে দিলো তানিয়া।

প্রিয় মানুষটির কপালে স্নেহচুম্বন এঁকে, প্রিয় বন্ধুকে জড়িয়ে ভালোবাসার স্মারক ব্যাট নিয়ে মাঠে চললো সেদিনের সেই মেয়ে পাগলা বখাটে প্রত্যয়। তাকে সেরাদের সেরা হতে হবে! তানিয়ার জন্য বার্থডে গিফট নিয়ে ফিরতে হবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here