গল্পঃ ‘সৌহার্দ্য’

পিচঢালা পথ, পথের ধারে সবুজ গাছের সমাহার। গাছের ছায়ায় ক্লান্ত পথিক, দিগন্তের পানে অবাক চাহনি। ফসলের খেলা মাঠজুড়ে, পথিকের ঠোঁটজুড়ে হাসির রেখা। মিষ্টি রোদ গাছের ফাঁক গলে স্পর্শের স্পর্ধায় অহংকারী। বেলা বাড়ে, রোদের তেজ কমে, পথিকের প্রস্থানের সময় ঘনিয়ে আসে। পথিক উঠে দাঁড়ায়, দিগন্তে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সে দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে যায়, চোখের কোণের ব্যয় হওয়া কয়েকফোঁটা জলের দাম পাবার আশা ছাড়াই পা বাড়ায়। ফিরতে হবে। আঁধারে আশ্রয় না খুঁজে বরং কলোনির মাঠে ঘুরে আসা যাক যেখানে একসময় ব্যাট হাতে অদম্য ছোটাছুটি ছিলো তার, তাদের, বন্ধুদের…

কি ছিলো না সেই মাঠে? উৎসব, উৎসাহ, উল্লাস, আনাড়ি কারো বেসুরো গান, সাঁঝবাতির আভায় দুরন্ত আড্ডা! সবই ছিলো, ছিলো একঝাঁক টগবগে উঠতি প্রাণ! অথচ আজ কলোনির মাঠে কোলাহল নেই, নির্জনতাও নেই! আজ তা সোসাইটিতে পরিণত। বিকালে চায়ের আড্ডা হয়না, মায়ের আড্ডা হয়! বাচ্চাদের পড়াশুনা, ভবিষ্যৎ ভাবনা। বাচ্চারাও থাকে। কার কম্পিউটারে কোন গেমস, নতুন ফিচার সম্পর্কে জানার আগ্রহে! কৈশোর কি এভাবেই কেটে যাবে ওদের? পথিকের মনের আর্কাইভ থেকে পুরনো দিনের অস্পষ্ট ছবির রোল কলোনির সদ্যজাত দালানে স্পষ্ট হয়ে উঠে…

পাড়ার ক্রিকেটে দোর্দণ্ড দাপট ছিলো তার। পাড়া ছাড়িয়ে দাপটের দামামা বেজেছিলো শহরেও! বেশ নামডাক। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং মিলিয়ে সর্বেসর্বা ছিলেন একটি টিমের। একদিন এক টূর্নামেন্টে পাড়ারই বছরখানেকের বড়ভাইয়ের কাছে ওভারের সবকটি বলে ছয় খেয়েছেন! সেইরাতে ঘুমোতে পারেননি। লজ্জায় বারবার নীল হয়েছেন। তবে কি সব গেলো? সুনাম, যশ, খ্যাতি? পরক্ষণেই মনে হলো, একটি ওভার কি অামার মানদন্ড? মোটেই না। ভাই-ই তো মেরেছে। তাছাড়া, খেলার বাইরেও অামাদের যে সম্পর্ক তা কি নিতান্ত কাঠ-সুতোয় মাপা যায়! শেষপ্রহরে ঘুম এলো, আরামের ঘুম, নিশ্চয়তার ঘুম…

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো শোরগোলে! বড়ভাইয়ের বন্ধুদের সাথে রক্তারক্তি কান্ড তার বন্ধুদের। উপলক্ষ ওই ছ’টি ছক্কা! তিনি নাকি ফিক্সিং করেছেন! যদিও, তা একেবারেই মিথ্যে। সাজানো গল্পের ন্যায় তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা!

এসব ভাবতে ভাবতে পিঠে আলতো ছোঁয়ার অনুভব। পেছন ফিরে তাকাতেই অবাক চোখজোড়া! বড়ভাইটি!

– ‘এই মাঠেই একদিন তোর ওভারে হাফডজন মেরেছিলাম। পাড়ায় সেকি ঝামেলা। কিন্তু দেখ, যখন দুজন একত্রে পাড়ার হয়ে নামতাম সবাই তখন একাত্ন হয়ে যেতো। আমার তোর বন্ধু বলে কিছু নেই, সব আমাদের হয়ে যেতো’।

– ‘খুব মনে পড়ে সেই দিনগুলি। রক্তমাখা মুখ, তাতে আবার পরম মমতায় ওষুধ লাগানো’।

– ‘ক্রিকেট আসলে এমনই! হাসায়, কাঁদায়, প্রেম জাগায়, আবার ভাঙ্গায়। কিন্তু বেলাশেষে ঠিকই বুকের মাঝখানে জায়গা করে নেয়’!

– ‘হুম। আজকের বাচ্চারা কি মজাটা পাবে? সেই ঝগড়া-বিবাদগুলিও কত না মধুর ছিলো। এই প্রজন্ম আমাদের গল্প শুনলেও অনুভূতির খাতায় শূন্য! ওরা যে জয় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। জানবে কি করে, শহর থেকে শহর, টূর্নামেন্ট থেকে টূর্ণামেন্ট ঘুরে অবশেষে একটি শিরোপার মূল্য কতটুক। রেডিমেড জিনিসে কি আর তিলে তিলে গড়ে তোলা শিল্পের আনন্দ মিলে’?

– ‘চল বাড়ি যাই’…
– ‘চলেন’…

পেছনে ফেলে আসা সোনালি অতীত। দুর্লভ সৌন্দর্য, মায়াশ্রী মুখ, যুদ্ধজয়ের তৃপ্তি, ভালোবাসা…

 

[লিখেছেনঃ জহিরুল কাইয়ুম ফিরোজ]   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here