ভ্যালেন্টাইন্স ডে স্পেশালঃ মাদ্রিদ ভক্তের গল্প

“সকাল নয়টা থেকে ক্লাস শুরু। মেস থেকে ভার্সিটি ক্যাম্পাসের দূরত্ব বেশি না। মিনিট পনেরোর হাঁটা পথ। আমাদের ঘুম ভাঙে আটটার পর। উঠে ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা সেরে ক্লাসের দিকে রওনা হই। রাফিদ বেচারাকে উঠতে হয় সেই ছয়টায়। ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট ও। ভাল ছাত্র। ফার্স্ট ইয়ারের ছোটভাইদের আবদারে ওদের পড়ায়। দুটো ব্যাচ। পঁয়তাল্লিশ মিনিট করে। সাড়ে ছ’টা থেকে সোয়া সাতটা, এরপর আটটা পর্যন্ত। শেষ ব্যাচটাকে ছাড়তে ছাড়তে আটটার পর প্রায়শই মিনিট দশ পনের ক্রস করে। ওই সময়টায় রাফিদ ছাত্রদের সাথে গল্প জুড়ে দেয়, রিয়াল মাদ্রিদের গল্প”…

ডায়েরিটা শুভ্র’র। রাফিদের মেসমেট। ব্যাচমেটও। একত্রেই চারটে বছর পড়ছে। দুজন মেসমেট হয়েছে যে বেশিদিন হয়নি যদিও। মাত্র চার মাস তিন দিন। শুভ্র মেধাবী। পাশাপাশি টুকটাক দৌঁড়ঝাপ। স্বপ্ন দেখে বোল্ট, টাইসন হবে। একদিন রাফিদকে যখন বলছিল স্বপ্নের কথা, রাফিদ বলল- ‘ফুটবল খেল। তোর গতি আছে, দক্ষতা আছে, পরিশ্রমের মানসিকতা আছে। একটা দিন মাদ্রিদের খেলা দেখ। দেখবি তোর শুধু বোল্ট না, মনে হবে তুই অনেক চরিত্রের প্রতিনিধি। গতিদানব বেল, স্কিলড ক্রুস মদ্রিচ। মাদ্রিদ তোকে চেনাবে, ঠিক ভেতরের তুইকে। আজ রাতে খেলা আছে, বসে পড়িস আমার সঙ্গে’।

সে রাতে রাফিদের সাথে জীবনে প্রথম রাত জেগে খেলা দেখি। প্রায় পৌণে দুইটায় খেলা শুরু। শেষ হতে হতে ভোর। সকালে ফের ক্লাস। এসবের মানে হয়? খেলা শেষ হলো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। ক্যাম্পাসে রাফিদকে সবাই হালামাদ্রিদ বলে ডাকে। আজ তাকে এ নামে ডাকতে আমারো ইচ্ছে হচ্ছিল। বেচারার মুখের দিকে তাকিয়ে পারিনি। মাদ্রিদ হেরে গেছে। বেল যাচ্ছেতাই, ক্রুস চেষ্টায় ত্রুটি রাখেনি। রোনালদোর খেলা বিশ্বকাপে দেখেছি। পত্রিকা আর রাফিদের কল্যাণে মোটামুটি চিনেওছি। একি! আজ সেই তাঁকে মাঠে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। খেলায় হারজিত থাকেই। সেটি নিয়ে রাফিদ চিন্তিত নয়। ওর চিন্তাটা আমাকে ঘিরে। মাদ্রিদ নিয়ে আমি কী ভাববো, আমাকে জোর করে বসিয়ে এমন ম্যাচ! তার সম্পর্কেই বা কেমন ফিডব্যাক দেবো?

পিঠে হাত রাখলাম রাফিদের। ‘আমরাই তো ব্যাটা। যা ঘুমা। সকালে আবার স্টুডেন্টরা আসবে’। সে কতটুকু তৃপ্ত হতে পেরেছে জানি না। তবে লজ্জিত হয়েছে ভীষণ।

আজকের সকাল রাফিদের জন্য অন্যরকম ছিল। গেলরাতে এযাবতকালে জীবনের সবচাইতে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সে। রাত তখন প্রায় পৌণে একটা। রাফিদের নাম্বারে অনবরত কল করেই যাচ্ছি। প্রথম কয়েকটা কল বিজি দেখালেও পরমূহুর্তে ফোন অফ। কখনোই এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকেনি। প্রায় মিনিট বিশেক টানা কল দেবার পর মনে এলো আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে। সন্ধ্যা থেকে রাফিদ নীরাকে নিয়ে ঘুরেছে। নীরা ওর গার্লফ্রেন্ড। আমাদের ভার্সিটিতেই পড়ে। সেকেন্ড ইয়ারে। রিলেশন প্রায় একবছরের। ওদের এবার এটাই প্রথম ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তবে কী দুজন লিপ্ত হলো!

রাফিদ এমন ছেলে না। তাই নির্ভার ছিলাম কিছুটা। তবু, মানুষের মন বলে কথা। চাহিদার ব্যাপার স্যাপার আছে। এমনটা ভাবতে ভাবতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘড়ির কাটা দেড়টার ঘরে। তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে থ হলাম! নীরাকে নিয়ে এসেছে রুমে। আমায় দেখে চোখ টিপলো নীরা। রাফিদও হাসছে। বেশ রাগ হচ্ছিল। তাহলে এখানেই হবে ওদের আদিমতার বিস্ফোরণ?

বিস্ফোরণ হয়েছে তবে আমার চিন্তাভাবনার।

‘ভাই, টিভি ছাড়েন। টাইম হয়ে গেছে। খেলা দেখব।’

নীরার এমন কথায় হতভম্ভ হলাম। সম্বিত ফিরলো রাফিদের ধাক্কায়। ‘এ টিভি ছাড় না। আর দশমিনিট আছে মাত্র’। সারারাত তিনজনে মিলে খেলা দেখলাম। খুঁনসুটি, আড্ডায় ভুলে গেলাম সাথে একজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষও আছে।

রাফিদটা সত্যিই ক্রেজি। শারীরিক বন্যতাকে এক পাশে ঠেলে ভালবাসার দিনে ভালবাসার মানুষকে নিয়ে রাতভর মেতেছে মাদ্রিদীয় হিংস্রতায়…

শুভ্রর ডায়েরিটা এখন নীরার হাতে। নীরা ডায়েরির একটি চরিত্র মাত্র। নীরার অবশ্য অস্তিত্ব আছে। ভিন্ন নামে, ভিন্ন চরিত্রে। ডায়েরির নীরার নাম প্রিয়ন্তী, শুভ্রর প্রেমিকা। শুভ্রই রাফিদ! রাফিদই শুভ্র। এক সত্ত্বার দ্বৈতরূপ। শুভ্র ছোটবেলা থেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছে। মাঝে দীর্ঘ সময় ভালো ছিল সে। ভার্সিটির প্রথম বর্ষে রাফিদের সাথে পরিচয়। অল্পদিনেই বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব হয় দুজনার। একবছর পর প্রিয়ন্তির আগমন। বেশ কাটছিল। মেয়েটা দারুণ ফুটবলের পোকা। রাফিদের মত সেও মাদ্রিদিস্তা। সবমিলিয়ে ভালো যাচ্ছিল তিনজনার দিনকাল।

হঠাৎ ছন্দপতন। দুই বন্ধু যাচ্ছিল বাইকে করে। হাইওয়েতে উঠেছে ওরা। তারপর অনেকগুলো মানুষ, ধোঁয়াটে চারপাশ, হট্টগোল। একপাশে গাড়িটা। ডাক্তাররা চেষ্টার কমতি রাখেনি। রাফিদের পুরোটা, শুভ্রর মেমরিকে বাঁচাতে। কোনটাই হয়নি।

প্রায় দুইমাস হয়ে গেল। প্রিয় রঙ সাদা জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে রাফিদ, শুভ্রও হাসপাতালের সাদা বেডে। মাঝেমধ্যে স্মৃতির কিছুটা ফিরে আসে। সব ওলটপালট করে দিয়ে যায়। শুভ্র তখন ডায়েরিতে সেসব লিখে রাখে। খানিক কল্পনায়, বাকীটা পুরনো গল্পের সারাংশে। রাফিদের নাম মনে আবছায়া হয়ে উঁকি দিলেও প্রিয়ন্তির নাম মনে আসে না। নিজেই তাই নাম দেয়, নীরা…

ডায়েরিটা কেবিনের উপর রেখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে প্রিয়ন্তি। প্রতিদিন সে ডায়েরি পড়ে। ভাবে, আজ বুঝি আরেকটু স্মৃতি ফিরল শুভ্রর। কখনো নীরার চাওয়াটা মিলে, কখনো আশাহত হয়ে বন্ধ করে। আশা ছাড়েনা, প্রাণের মাদ্রিদের মত।

শুভ্র উঠে যায় ঘুম থেকে। কেমন যেন ছন্নছাড়া।

‘এই রাফিদ, টিভিটা ছাড়। খেলা আছে’…

প্রিয়ন্তি ঘড়ি দেখে। রাত একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট!

টাইগার্সকেইভ/জহিরুলকাইয়ুম   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here